রাশেদ কবীর: শিল্পের জাদুকাঠির ছোঁয়ায় বাঙালি সংস্কৃতির দিগন্ত উন্মোচনকারী, লাখো নবীনের প্রিয় ‘শিল্পগুরু’ মুস্তাফা মনোয়ার আর নেই। তাঁর প্রয়াণে অবসান হলো বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের এক সোনালী অধ্যায়ের। আজ (৩০ জুন) কৃতজ্ঞ দেশবাসীর পক্ষ থেকে এই মহান সাধককে অশ্রুসিক্ত নয়নে শেষ শ্রদ্ধা জানানো হয়। তাঁর এই মহাপ্রয়াণে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে যে শূন্যতার সৃষ্টি হলো, তা অপূরণীয়।
আজ সকাল থেকেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গ থেকে এই গুণী মানুষের মরদেহ সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধার্পণের জন্য নিয়ে আসা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। সেখানে এক অভূতপূর্ব আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশানের উদ্যোগে এবং বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের অংশগ্রহণে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ রূপ নেয় এক শোকাকুল সমুদ্রে। শিল্পগুরুর কফিনে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে একে একে শ্রদ্ধা জানায়:
বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশান
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট
বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী
ছায়ানট
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ
বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটিসহ দেশের অসংখ্য সামাজিক, নাট্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীবৃন্দ।
শহীদ মিনারে উপস্থিত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা গভীর শোক প্রকাশ করে জানান, মুস্তাফা মনোয়ার কেবল একজন চিত্রশিল্পী বা পাপেট নির্মাতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশে পাপেট থিয়েটার ও সৃজনশীল শিল্পকলার প্রসারে এক অনন্য বাতিঘর। বিশেষ করে টেলিভিশনের মাধ্যমে শিশুদের মনন গঠনে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
শ্রদ্ধা জানাতে আসা বিশিষ্টজনেরা বলেন, "শিল্পের এমন কোনো শাখা নেই যেখানে তাঁর হাতের জাদুস্পর্শ লাগেনি। তিনি আমাদের যেভাবে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন, লাখো নবীনকে যেভাবে শিল্পের পথ দেখিয়েছেন—তা বাঙালি জাতি কোনোদিন ভুলবে না।"
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে দুপুর ১২টার পর শিল্পগুরুর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে। সেখানে বাদ জোহর তাঁর নামাজে জানাজা সম্পন্ন হয়। জানাজায় অংশ নেন তাঁর দীর্ঘদিনের সহকর্মী, ভক্ত, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং বিভিন্ন পেশার সাধারণ মানুষ।
জানাজা শেষে তাঁর মরদেহ চিরতরে সমাহিত করার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। বাঙালি সংস্কৃতির এই বাতিঘর সশরীরে বিদায় নিলেও, তাঁর রেখে যাওয়া পাপেট শিল্প, অনন্য চিত্রকর্ম এবং সৃজনশীল ভাবনা তরুণ প্রজন্মের হাত ধরে যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকবে—এমনটাই বিশ্বাস শোকসন্তপ্ত দেশবাসীর।