স্মৃতিতে স্কাউটিং: ফেলে আসা সোনালী দিনগুলো

– মিন্টু মিয়া
সংগ্রহ (আমির হোসেন): সময়ের চাকা ঘুরে আজ আমরা সবাই আবার এক জায়গায় মিলিত হয়েছি। চারপাশের চেনা মুখগুলো দেখে স্মৃতির পাতাগুলো যেন হঠাৎ করেই উল্টাতে শুরু করেছে। জীবনের কত শত গল্প এই প্রিয় কলেজের প্রতিটি কোণায় লুকিয়ে আছে! তবে আমার কলেজ জীবনের একটা বড় এবং সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় জুড়ে আছে একটি শব্দ—'স্কাউটিং'।
২০০৩ সাল। নতুন উদ্দীপনা আর কৌতূহল নিয়ে পা বাড়িয়েছিলাম স্কাউটিংয়ের আঙিনায়। তখন হয়তো পুরোপুরি বুঝিনি, এই আন্দোলনটি আমার জীবনকে কতটা বদলে দেবে। কিন্তু ২০১১ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ আটটি বছর যখন স্কাউটের লাল-বেগুনি স্কার্ফটা গলায় জড়িয়ে রেখেছিলাম, তখন সেটি শুধু একটি পোশাক বা নিয়মের অংশ ছিল না; সেটি হয়ে উঠেছিল আমার অস্তিত্বের অংশ।
আমার স্কাউট জীবনের প্রথম ক্যাম্পের স্মৃতি আজ আজীবন মনে রাখার মতো রোমাঞ্চকর এক অধ্যায়। ভেন্যু ছিল সাভারের মির্জা গোলাম হাফিজ কলেজ, যেখানে অনুষ্ঠিত হচ্ছিল ঢাকা জেলার '১০ম জেলা রোভার মুট'। ক্যাম্পের শুরুর দিন থেকেই আকাশ ভেঙে নামল প্রচণ্ড গতিতে বৃষ্টি। বৃষ্টির সেই তীব্রতায় মাঠের তাঁবুতে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ায়, আমাদের প্রথম আশ্রয় মিলল কলেজের মূল ভবনের ভেতরে। চারদিকে তুমুল বৃষ্টির শব্দ, নতুন পরিবেশ, আর তার ওপর বসার বা শোয়ার মতো জুতসই জায়গা নেই—সব মিলিয়ে প্রথম রাতটা ছিল ভীষণ চ্যালেঞ্জিং। এক ফোঁটা ঘুম চোখের পাতায় ধরা দেয়নি কারও, কেবলই কেটেছে এক চরম ধকল আর কষ্টমষ্টের মধ্য দিয়ে।
কিন্তু স্কাউটিং তো আমাদের প্রতিকূলতাকে জয় করতেই শেখায়! পরের দিন আমরা তিন বন্ধু মিলে এক বুদ্ধিদীপ্ত পরিকল্পনা করে ফেললাম। যে করেই হোক, ঘুমানোর একটা ব্যবস্থা করতেই হবে। যেই ভাবা সেই কাজ—তাঁবুর ভেতরেই আমরা নিজেদের মেধা আর খাটাখাটনি দিয়ে চমৎকার একটা বাঁশের 'মাচা' তৈরি করে ফেললাম। পরের রাতগুলোয় যখন বাইরের বৃষ্টির দাপট চলছিল, তখন আমি আর আমার দুই বন্ধু—সৈয়দ আবু বকর সিদ্দিক আজিম ও কামাল হোসেন সেই নিজেদের তৈরি মাচার ওপর বেশ আরামেই রাত্রিযাপন করেছি। প্রথম ক্যাম্পের সেই তুমুল বৃষ্টি, শুরুর রাতের কষ্ট আর বন্ধুদের সাথে মিলে মাচা বানিয়ে ঘুমানোর সেই আনন্দ—আজও আমার স্মৃতির পাতায় অন্যতম সেরা এক অভিজ্ঞতা হয়ে টিকে আছে।
এই প্রথম ক্যাম্পের পর স্কাউটিংয়ের পথচলা আর থেমে থাকেনি। একে একে যুক্ত হয়েছে ২০০৪ সালে গাজীপুরের বাহাদুরপুরে '৪র্থ জাতীয় রোভার মুট'-এর ঘন শালবনের অভিজ্ঞতা, ২০০৫ সালের '১১তম ঢাকা জেলা রোভার মুট' এবং ২০০৭ সালে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে অনুষ্ঠিত '৪র্থ জাতীয় কমডেকা'-র মতো সমাজ উন্নয়নমূলক ও সেবাধর্মী বিশাল আয়োজন। ২০১০ সালে '১২তম ঢাকা জেলা রোভার মুট'-এ সিনিয়র রোভার হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং স্কাউটিংয়ের শতবর্ষ উপলক্ষে চলন্ত ট্রেনে আয়োজিত '১ম জাতীয় স্কাউট ট্রেন জাম্বুরি'-র সেই রোমাঞ্চকর দিনগুলো আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ হয়ে থাকবে।
স্কাউটিং আমাকে শিখিয়েছে জীবনের আসল মানে। "সর্বদা প্রস্তুত"—এই একটি মূলমন্ত্র যে কীভাবে একজন মানুষকে যেকোনো পরিস্থিতিতে ধৈর্যশীল এবং কর্মঠ রাখতে পারে, তা ক্যাম্পের সেই কঠিন দিনগুলোতে প্রতি পদে পদে টের পেয়েছি। তাবু জলসা, হাইকিং, কায়িক শ্রম, আর গভীর রাতে ক্যাম্পফায়ারের আগুনের শিখার দিকে তাকিয়ে বন্ধুদের সাথে গান গাওয়ার সেই স্মৃতিগুলো আজও মনে দাগ কেটে আছে।
কলেজের সেই দিনগুলোতে আমরা শুধু শৃঙ্খলা শিখিনি, শিখেছি নিঃস্বার্থ সেবা দিতে। যেকোনো দুর্যোগে, কলেজের নানা অনুষ্ঠানে বা আর্তমানবতার সেবায় আমরা স্কাউট দল যেভাবে ঝাঁপিয়ে পড়তাম, তা আজ ভাবলে বুকটা গর্বে ভরে ওঠে। সেই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার শিক্ষা, নেতৃত্ব দেওয়ার গুণ আর ভ্রাতৃত্ববোধ—আজকের এই ব্যস্ত নাগরিক জীবনেও আমাকে প্রতিনিয়ত পথ দেখায়।
২০০৩ থেকে ২০১১—এই আট বছরে কত ক্যাম্প করেছি, কত নতুন বন্ধু পেয়েছি, কত রাত জেগে ডিউটি করেছি, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। আজ হয়তো সেই স্কার্ফটা আলমারিতে যত্ন করে রাখা, কিন্তু স্কাউটিংয়ের আদর্শটা এখনো মনে সমানভাবে জীবন্ত।
আজকের এই ঐতিহাসিক পুনর্মিলনীতে দাঁড়িয়ে সমস্ত প্রাক্তন স্কাউট ভাই, সহযোদ্ধা ও শ্রদ্ধেয় লিডারদের জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। আমরা যেখানেই থাকি, যেভাবেই থাকি, স্কাউটের সেই দীক্ষা যেন আমাদের মনে আজীবন অম্লান থাকে—"একবার স্কাউট, চিরকাল স্কাউট।