

দশ বছর আগে আজকের দিনে, মাধবকুণ্ডে…(জামিল জাহাঙ্গীর)
দশ বছর আগে আজকের এই দিনে ছিল মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া–জুড়ি–বড়লেখা সফরের এক অনন্য অধ্যায়। সেবার কুলাউড়া জংশন স্টেশনে নেমেই সোজা চলে গিয়েছিলাম অগ্রজ কবি ও চিত্রকর চঞ্চল আক্তার ভাইয়ের বাসায়। আমি ছাড়াও আরও অনেক অতিথি ছিলেন তাঁর স্নেহময় আতিথ্যে।
পাঁচ দিনের সেই সফরে একে একে ঘুরেছি হাকালুকি হাওর, জুড়ি নদী, কন্টিনালা, বড়লেখা, গাজীপুর চা-বাগানসহ আরও অনেক স্থান। প্রতিটি দিনই ছিল নতুন আবিষ্কারের, নতুন বিস্ময়ের। আর সেই সফরের অন্যতম আকর্ষণ ছিল মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত।
সকালের আলো তখন পাহাড়ের গায়ে নরম হয়ে নেমে এসেছে। চারদিকে শুনশান নীরবতা। সেই নীরবতার বুক চিরে শুধু জলের কলকল ধ্বনি। হিমশীতল, পেলব এক আবহে ভরে উঠেছিল পুরো প্রপাত এলাকা। পতনের দু’পাশে সজীব গাছপালার সবুজ হাসি যেন প্রকৃতির নিজস্ব অভ্যর্থনা।
মাধবকুণ্ডের জলের উৎস সম্পর্কে কৌতূহল ছিল প্রবল। জানা যায়, পাথারিয়া পাহাড়শ্রেণির অসংখ্য বৃষ্টিনির্ভর পাহাড়ি ছড়া ও ঝরনার মিলিত প্রবাহ খাড়া শিলাস্তর বেয়ে নিচে নেমে সৃষ্টি করেছে এই জলপ্রপাত। বর্ষায় সেই প্রবাহ আরও উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে, আর শুষ্ক মৌসুমে কিছুটা শান্ত হলেও তার সৌন্দর্য ম্লান হয় না।
এই কৌতূহলই আমাকে উৎসের দিকে টেনে নিয়ে চলল। খাড়া পাথুরে পথ ধরে যত ওপরে উঠছিলাম, ততই বাড়ছিল বিস্ময়। একসময় পথ এতটাই বিপজ্জনক হয়ে উঠল যে আর এগোনো সম্ভব হলো না। মনে হলো, প্রকৃতি তার সব রহস্য মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে রাখে না। কিছু বিস্ময় দূর থেকেই অনুভব করতে হয়।
নিচে নেমে এসে দেখা মিলল মৎস্যকুমারীর। সিমেন্ট আর রডে গড়া হলেও তার নীরব উপস্থিতিতে যেন ছিল এক অলৌকিক প্রাণ। কিছুক্ষণ তার সঙ্গেও কাটিয়ে দিলাম।
এরপর নেমে এলো বৃষ্টি। অবিরাম, অন্তহীন, পরাবর্তের মতো একটানা বৃষ্টি। পাহাড়, পাথর, ঝরনা আর মানুষ—সব একাকার হয়ে গেল জলের উল্লাসে। আহা, কী যে ভিজেছিলাম! অনেক দিন এমন করে ভেজা হয়নি। মনে হয়েছিল, মাধবকুণ্ডের জল শুধু শরীর নয়, আত্মাকেও ধুয়ে-মুছে নির্মল করে দেয়। সেই স্নিগ্ধতা বহু দিন ধরে আমার ভেতরে রয়ে গিয়েছিল।
আজও মনে হয়, মাধবকুণ্ড কেবল একটি জলপ্রপাত নয়; এটি পাহাড়, জল, বন আর নীরবতার এক অপূর্ব সম্মিলন। প্রকৃতি যখন নিজের ভাষায় কথা বলে, তখন শব্দের প্রয়োজন হয় না—শুধু বিস্মিত হয়ে শুনে যেতে হয় তার অনন্ত কলকল ধ্বনি।
সংগ্রহ-আমির হোসেন