মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস থেকে আজকের বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা—প্রশ্ন উঠছে, দেশের স্বার্থের চেয়ে বিদেশি স্বার্থ কি বড় হয়ে যাচ্ছে?
নোবেলজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস ক্ষুদ্রঋণের প্রবক্তা হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। একই সময়ে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কও নতুন মাত্রা পায়। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে ড. ইউনূসের বৈঠক এবং পরবর্তী সময়ে দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়।
তবে এখানেই প্রশ্ন—বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত?
ইতিহাসে মীরজাফরের নাম বিশ্বাসঘাতকতার প্রতীক হয়ে আছে। পলাশীর প্রান্তরে সিরাজউদ্দৌলার পতনের পর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত হয়েছিল। সেই ইতিহাস আজও বাঙালির রাজনৈতিক চেতনায় গভীর ক্ষত হয়ে আছে।
তাই যখন দেশের কোনো সরকার বা রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে বিদেশি শক্তির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়, তখন সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে—এই সম্পর্ক কি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও জাতীয় স্বার্থকে শক্তিশালী করছে, নাকি কোনো পর্যায়ে দেশের নীতিনির্ধারণে বিদেশি প্রভাব বাড়িয়ে দিচ্ছে?
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু চুক্তি ও আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি দুই দেশ Agreement on Reciprocal Trade স্বাক্ষর করেছে। এতে মার্কিন পণ্যের জন্য বাংলাদেশের বাজারে বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রবেশাধিকার, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শ্রম অধিকার, ডিজিটাল বাণিজ্য, জ্বালানি ও অন্যান্য বিষয়ে বাংলাদেশের কিছু প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
এই চুক্তি নিয়ে তাই স্বাভাবিকভাবেই জাতীয় স্বার্থের প্রশ্ন তোলা যেতে পারে। বাংলাদেশের বাজার, কৃষি, শিল্প, শ্রমবাজার, স্থানীয় উৎপাদক এবং অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব—সবকিছুর ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী হবে, তা জনগণের সামনে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি—“২০২৪ সালে ড. ইউনূস ও ওয়াকার-উজ-জামান মিলে বাংলাদেশকে লিখিতভাবে আমেরিকার কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন”—এমন দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য সরকারি নথি পাওয়া যায় না। তাই রাজনৈতিক সমালোচনা করতে হলে প্রমাণিত তথ্যের ভিত্তিতেই প্রশ্ন তোলা উচিত।
কারণ দেশ কোনো ব্যক্তির সম্পত্তি নয়। বাংলাদেশ ১৮ কোটি মানুষের। রাষ্ট্রের সম্পদ, সার্বভৌমত্ব ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার কোনো ব্যক্তি, দল কিংবা বিদেশি শক্তির কাছে বন্ধক রাখার অধিকার কারও নেই।
আজ দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে যদি দ্রব্যমূল্য, কর্মসংস্থান, আয়-ব্যয় এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা তৈরি হয়ে থাকে, তবে তার দায় শুধু একজন ব্যক্তি বা একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপিয়ে দিলে সমস্যার সমাধান হবে না। রাজনৈতিক নেতৃত্ব, প্রশাসন, ব্যবসায়ী সমাজ, বুদ্ধিজীবী, সুশীল সমাজ এবং মানবাধিকার সংগঠন—সবারই দায়িত্ব দেশের মানুষের অধিকার ও স্বার্থের পক্ষে দাঁড়ানো।
মীরজাফরের ইতিহাস যেন আবার ফিরে না আসে—এটাই হোক আমাদের সবচেয়ে বড় সতর্কতা।
বাংলাদেশ কোনো পরাশক্তির উপনিবেশ নয়, কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পত্তিও নয়। বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থেই হতে হবে।
দেশ বিক্রির অভিযোগ নয়—দেশের স্বার্থ রক্ষার প্রশ্নেই হোক আমাদের প্রতিবাদ, আমাদের জবাবদিহি এবং আমাদের রাজনৈতিক আলোচনা।
Like this:
Like Loading...
Related